মরীচিকা পর্ব -০২

0

মরীচিকা
পর্ব -০২

রাত ৮.৩০..
রাহি এই ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে দারোয়ানের পাশে বসে আছে।দারোয়ানের নাম জলিল মুন্সী। মধ্য বয়সী হবে হয়তো,হালকা গড়নের, চেহারায় উষ্ক একটা ভাব।মনে হয় শিক্ষিত দারোয়ান, তার হাতে একটা বই,বইয়ের নাম ‘কাল পুরুষ’। এই গরমের মধ্যেও সে একটা চাদর পড়ে বসে আছে।

জলিল,দিপু ভাই কখন ফিরেন প্রায়ই?
-রাত ৮ টার আগেই বাড়ি ফিরবার দেখি স্যারকে প্রতিদিন।আজ মনে হয় আসবে না উনি ৮ টার পর ফিরেন না।
ফিরেন না মানে কি!কই যায়?
-তা তো জানি নে।
অহ!
-স্যার উনার কিছু হইছে নাকি? আপনের আগেও একজন ম্যাডাম এসে খুজে গেলেন..
কোন ম্যাডাম?
-অতন্দ্রিতা নামের একজন এসেছিলো সন্ধ্যায়।একটা সাদা কার্ড দিয়ে গেছেন।কার্ডে কোন নম্বর নেই কিন্তু কার্ডের পেছনে লেখা রাতে ফোন দিবেন দয়া করে।
অহ! আচ্ছা।

দারোয়ান একটু পর পর বলছে,স্যার একটা সিগারেট খাই? সে প্রায় এই অনুমতি ৫ বার নিলো !রাহি একবার শান্ত গলায় বলেও দিলো,দফায় দফায় এত অনুমতি না নিলেও হবে।সিগারেট খাওয়া খুব কঠিন অপরাধ নয়।

সারাদিন কড়া রোদের পর এখন একটা ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে।মাঝে মাঝে ধুলাবালি উড়ে এসে চোখে মুখে আছড়ে পড়ছে। জলিল মুন্সীর এ নিয়ে কোন চিন্তা নেই,সে আপন মনে একের পর এক সিগারেট ধরাচ্ছে।কিন্তু কোন সিগারেটই সম্পুর্ণ শেষ না করেই ফেলে দিয়ে আবার ধরাচ্ছে নতুন একটা।

রাহি জলিলকে বললো,সিগারেট এভাবে নষ্ট করছো কেন? অপচয় কারী শয়তানের ভাই জানা নেই?

জলিল – স্যার,মনে সাহস দিলে আপনের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি।
রাহি- হুম বল।
জলিল-স্যার,এই যে আপনি একটা চিঠির খাম হাতে নিয়ে আধা ঘন্টা যাবৎ বসে আছেন এটাও অপচয়,সময়ের অপচয়। আমি তো বললাম আজ দিপু স্যার বাসায় ফিরবেন না, রাত ৮ টার আগেই উনি বাড়ি ফিরেন।যদি কোন কারণে রাত ৮ টা পার হয় তাইলে আর বাড়ি ফিরেন না।তবুও বসে আছেন কেন?
আমরা হয়তো জেনে বুঝেও অনেক কিছুর অপচয় করে অভ্যস্ত।
আমার এই অপচয় এর সাথে আর একটা কারণও আছে..
– কী কারণ?
– স্যার! শেক্সপিয়ার নামের এক লেখক নাকি সিগারেটের শেষ টান নিয়ে খুব মাতামাতি করে গেছেন,কিন্তু আমি এর উলটা করে নিজেকে বোঝাচ্ছি এটা নিয়ে মাতামাতির কিছুই নেই।
রাহি একটা মৃদু হাসি দিলেন মাত্র।কথা বাড়াতে ইচ্ছা না করলে মৃদু হাসিই একমাত্র সুন্দর সিস্টেম।

রাত প্রায় ৯ টা। রাহি হেটে চলছে।মাঝে দুই একটা গাড়ি খুব জড়ে টেনে চলে যাচ্ছে। হয়তো আকাশে মেঘ দেখেই এই দ্রুততা!বৃষ্টি নাকি সবার এত পছন্দ তাইলে মেঘ দেখলে সবাই ঘরে ফিরে কেন?
ঝড়ো আবহাওয়ার কারণে রাস্তায় সেভাবে রিক্সাও দেখা যাচ্ছে না। দুই একটা যা আসছে সামনে, মনের সুখে বলে দিচ্ছে,যামু না।মাঝে মাঝে রিক্সাওয়ালারাও রাজা বাদশার মত ভাব করে।
বই বাজারের কয়টা দোকান ফেলে আসতেই এক নারী কণ্ঠ রাহির কানে ভেসে এলো।স্যার.. স্যার।
পেছন ফিরে তাকাতেই দেখে ‘ইমা’। সাথে এক সাত আট বছরের বাচ্চা ছেলে।
স্যার,আসসালামুয়ালাইকুম। কেমন আছেন?
-ভাল।তুমি কেমন আছো ইমা? এখন কোথায় পড়ছো?
স্যার,ভাল আছি।আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২য় বর্ষ। আপনার সাথে কত বছর পর দেখা আমার, সেই চারবছর আগে ফেব্রুয়ারীতে আপনার সাথে শেষ দেখা ছিল।কত বার ফোন করেছি কিন্তু নম্বর বন্ধ!! কত খুজেছি রাস্তায়..
বলতে বলতে চোখ টা ছলছল করতে শুরু করলো।

মেয়েরা খুব সহজে আবেগ প্রবণ হয়ে উঠে। সবুজ রঙের জামাতে কাউকে এত সুন্দর লাগে তা রাহির জানা ছিল না।মুখটা হালকা আলোতে জ্বলছে মনে হয়।আলো আধারের মাঝে এক অপরুপার চোখেরর পানি দেখতেও কেন যেন ভাল লাগছে রাহির।

কি ব্যাপার এত রাতে এখানে কি করো ইমা?তোমার স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে।
– স্যার!বই কিনতে এসেছি,ভুতের গল্পের বই।মেঘের রাতে ভুতের গল্প পড়তে ভাল লাগে স্যার আমার।
তাই বলে এত রাতে!কাল আসলেও পারতে..
-স্যার,এইতো তিন বিল্ডিং পরেই আসমানী রঙ এর বাসাটা আমাদের বাসা। আমরা এখন এখানে থাকি। স্যার,চলেন আমাদের বাসায়।আম্মা আপনার কথা প্রায়ই বলে.. মা যখন বলে আপনার কথা আমার কিঞ্চিৎ রাগ হয় স্যার!আমি মাকে বলি, উনি তো আমাদের মনে রাখেন নাই, তুমি কেন রাখছো?

রাহি মৃদু একটা হাসি দিয়ে চুপ করে রইলো। আসলেই সেই ৪ বছর আগে যখন ইমা ক্লাস টেন।এখন ইমা পড়ে ইউনিভার্সিটিতে।ইমার রাগ হওয়া যুক্তিযুক্ত।

আচ্ছা ইমা আমি অন্য কোন দিন তোমাদের বাসায় আসবো কিন্তু আজ আমার তাড়া আছে একটু।ভাল থাকো আবার দেখা হবে হয়তো..

রাহি হাটা শুরু করলো, কিঞ্চিৎ পরে আবার ইমার কন্ঠ! স্যার স্যার.. ইমা দৌড়ে আসছে।
স্যার,এই যে এটা আমার ফোন নম্বর।আসলে আমাকে ফোন করে আসবেন স্যার।

গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হচ্ছে। মাঝে মাঝে মাঝারি আকারে বজ্রপাত।অনেক ক্ষণ যাবৎ এই গুড়ি বৃষ্টির কারণে রাহি অনেকটা টা ভিজেও গেছে।রাহি ভিজে গেলেও তার এটা মাথা ব্যাথা নেই খুব একটা। কিন্তু দিপুর নামে আসা এই চিঠিটা যদি ভিজে যায় তাহলে সেটা খারাপ দেখাবে।

এই চিঠির রুপ একটু ভিন্ন।চিঠি আসলে আসবে বাশপাতার খামে কিন্তু এই চিঠি এসেছে সাদা এক খামে।চিঠি ডাক যোগে আসে নি দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
দেখেই বোঝা যাচ্ছে অদক্ষ হাতে বানানো অথবা সল্প সময়ে বানানো। অফিস বন্ধের ঠিক একটু আগে অফিসের দারোয়ান এসে এই চিঠি দিয়ে বললেন,’দিপু স্যারের চিঠি।যিনি দিলেন উনি বললেন,দ্রুত দিপুকে দিবেন, জরুরী খুব জরুরী..’

চিঠির নিচের কোণে নীল কালিতে ছোট্ট করে লেখা.. ‘মৃদুলা’