মরীচিকা পর্ব -০৩

0

মরীচিকা পর্ব -০৩

 

এত সকালে গত একবছরেও বিছানা থেকে উঠে নি অতন্দ্রিতা। এই নতুন রেকর্ড হবার পেছনে দায়ী বৃষ্টি। বাহিরে মুশুলধারে বৃষ্টি হচ্ছে, সমস্যা বৃষ্টি নিয়ে নয়, সমস্যা হচ্ছে মাঝে মাঝে প্রকট শব্দে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।ছোট বেলা থেকেই বিদ্যুৎ চমকালে অতন্দ্রিতার ভীষণ ভয় লাগে কেন যেন। ছোট বেলার কিছু কিছু ভয় আজীবন ভেতরে থেকে যায়। জানালা খুলে দিতেই হাল্কা ঠান্ডা হাওয়া এসে অতন্দ্রিতার শরীরে আছড়ে পরলো।মুশুলধারে বৃষ্টির কারণে ফোটা ফোটা পানিও মাঝে মাঝে ছিটে এসে তার মুখে পড়ছে।
অতন্দ্রিতার ভেতরে এক সজীব অনুভুতি কাজ করছে এখন।

আজ কাজের মেয়েটা আসবে না এটা ধরে নেওয়া যেতেই পারে।ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে সকালে নিশ্চয় রুটি আর সবজি করতে হালিমা আসবে না।হালিমার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে,সে হাস্যকর রকমের অজুহাত বানিয়ে ছুটি নেয় মাঝে মাঝে।
অনেক দিন পর নিজহাতে খাবার তৈরি করে খেয়ে বের হলেন অতন্দ্রিতা। এখনো গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে, একটা রিক্সা ধরে অফিসের গেটের সামনে নামতেই দেখা পেল দিপুর। দিপু ছাতা ছাড়া হেটে আসছে,গায়ে সাদা রংয়ের শার্ট বৃষ্টির পানিতে একদম শরীরে লেপ্টে আছে। কেন যেন এমন ভেজা শরীরে দিপুকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে অতন্দ্রিতার চোখে।
দিপু অতন্দ্রিতার পাশ দিয়ে এমন ভাবে হেটে অফিসে ঢুকে গেলেন যেন অতন্দ্রিতাকে চোখেই পড়লো না! অতন্দ্রিতারও কিছু বলতে ইচ্ছা করলো না। শুধু তাকিয়ে ভাবছিলো,’দিপু আসলেই তো বেশ সুন্দর।’

দিপু অফিসে যেতে না যেতেই রাহি বেশ উৎকন্ঠার সহিত বলে উঠলো,দিপু ভাই আপনি সারা রাত কই ছিলেন?
-কেন?
আমি গতকাল আপনার বাসায় গিয়েছিলাম কিন্তু আপনি নাকি ৮ টার পর বাড়ি ফিরেন না!
দিপু রাহির দিকে তাকিয়ে বললো,একটু পরে আমি আপনার ডেস্কে আসছি ভাই।এক কাপ চা খেয়ে নি।
দিপু হাত উঁচিয়ে মতিন কে ডাকলো।মতি মিয়া,এক কাপ চা দিয়ে যাও তো।

মতিন সারা দিন নামাজ পড়ে না কিন্তু সারাদিন মাথায় টুপি পড়ে
থাকে,গায়ে কড়া গন্ধের আতর মেখে ঘুরে বেড়ায়।তার ভাষ্যমতে,আতরের গন্ধ নাকি ফেরেস্তাদের খুব পছন্দ তাই সে ফেরেস্তাদের খুশি রাখে।
মতিনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে,’তাকে যদি বলা হয় চিনি কম দিবে চায়ে,সে দিবে বেশি আবার বেশি দিতে বললে কম দেয়’।
এ নিয়ে প্রতিদিন সে অনেকজনের কাছে হেনস্তা হয় কিন্তু তার মুখ দেখে তা বোঝা যায় না।কেউ গালি দিলেও সে হাসি মুখে বলে,’আচ্ছা সমস্যা নেই।’ এটা মনে হয় মতির কমন কথা।
প্রতিটি মানুষের হয়তো ভিন্ন ভিন্ন কিছু মুখের বুলি থাকে।

এই প্রথম দিপু অতন্দ্রিতার মাখা সেই পারফিউমের গন্ধ পাচ্ছে না।দিপুর মনে কিছুটা প্রশান্তি বিরাজ করলেও দিপু কিছুটা অস্বস্তিও অনুভব করছে।কাজে মন দিতে পারছে না। একটু পর পর মাথায় চিন্তা আসছে পারফিউম নিয়ে।আজ কেন গন্ধটা নেই? একবার ভাবছে পারফিউম টা শেষ হয়ে গেছে হয়তো আবার ভাবছে এই ঝড়ো আবহাওয়ার কারণে হয়তো মেখে আসে নি।পারফিউম মাখা ঋতুর উপর নির্ভরশীল অনেকটা।
গত কয়েকদিন কাজে ঠিক মত মন দিতে না পারায় অনেক কাজ জমে গেছে দিপুর।কিভাবে কোনটা দিয়ে শুরু করবে বুঝতে পারছে না।অনেক কাজ জমে গেলে মস্তিষ্ক একটু বিপদে পড়ে যায়,নিজেকে গুছিয়ে নিতে বেশ সময় নেয়। টানা দুই ঘন্টা কাজের দরুণ দিপুর একটু মনে স্বস্তি কাজ করছে। জমে থাকা একটা কাজ আপাতত তার শেষ।
বামপাশে তাকাতেই দেখে অতন্দ্রিতাও বেশ মন দিয়ে কাজ করছে।মানুষ যখন মন দিয়ে কাজ করে তখন তার রুপের কিঞ্চিৎ ভিন্নতা আসে। কপালে হালকা ভাজ পড়ে। হালকা ভেজা চুল,ঠোঁটে হাল্কা গোলাপী রঙের লিপস্টিক,ঠোঁটের ঠিক নিচের বামপাশে কোণে ছোট্ট একটা তিল তার বড় বড় নখ!মেয়েরা নখ কেন আজকাল বড় রাখে কে জানে? এই প্রথম দিপুর কেন যেন ইচ্ছা হলো,অতন্দ্রিতার সাথে এককাপ চা খেলে মন্দ হয় না!
না!এটা দিপুর বলা সম্ভব না।যদি অতন্দ্রিতা বলে আবার তাইলে দিপু আর না করবে না।
দিপু মাঝে মাঝেই তাকাচ্ছে। হঠাৎ অতন্দ্রিতা বলে উঠলো,দিপু সাহেব কিছু বলবেন??
-কই না তো!
বারবার তাকাচ্ছেন যে?
-না!কই? আমি আসলে দেখছিলাম রাহি তার ডেক্সে আছে কি না।
দিপু সাহেব,মেয়েদের দিকে যদি কোন ছেলে বারবার তাকায় তাইলে মেয়েরা সেটা খুব দ্রুত ধরতে পারে।তাদের এই বিশেষ ক্ষমতা আছে।
-অহ আচ্ছা।
বলে ফেলুন।বলে মুখে একটা মৃদু হাসি দিলেন অতন্দ্রিতা।
-মতিন মিয়ার চা আপনার কেমন লাগে?
ভীষণ সুন্দর!আমি যেই ভাবে বলি ঠিক মাপেই বানায়।চা যদি সঠিক ভাবে না বানানো হয় তাইলে মুখে দিতে ইচ্ছা করে না।
-কিন্তু মতি মিয়া তো চা বানায়….
আচ্ছা! তাইলে আপনি একদিন আমাকে বানায় খাওয়ান এককাপ চা।আপনার হাতে বানানো চা খারাপ লাগবে না আমার কাছে মনে হয়।

দিপুর খানিকটা লজ্জা পেল।লজ্জা ঢাকার জন্য হলেও এখন রাহির খোজে যাওয়া দরকার।দিপু উঠে দাড়ালেন।রাহির টেবিলের দিকে আগাতেই দেখা গেল রাহি নেই ডেক্সে।দিপু রাহির পাশের ডেক্সের বসা মুহিবের কাছে গিয়ে জানতে পারলেন,রাহি অর্ধবেলা ছুটি নিয়ে খুব দ্রুত চলে গেছে।তার বড় মামার ছোট মেয়ে নাকি হারপিক খেয়েছে।
দিপু ফিরে এলো তার ডেক্সে।বসে কাজ শুরু করলেন আবার।হঠাৎ মতিন এসে বললো,স্যার আপনের চায়ের কাপটা..
কাপ দিতে গিয়ে দিপু দেখলেন কাপের নিচের একটা কাগজে লাল কালিতে লেখা, ‘দিপু সাহেব ক্যান্টিনে আসুন’
দিপু লেখা টা হাতে নিয়ে বসে ভাবছে কি করবে।মাঝে মাঝে এমন কিছু স্বাভাবিক ঘটনাও মানুষকে বিড়ম্বনায় ফেলে দেয়।
ক্যান্টিনের উপরটা টিনের এবং বেশ খোলামেলা।আলো বাতাস খুব সুন্দর ভাবে বিচরণ করে।
ক্যান্টিনে অতন্দ্রিতা দুইকাপ চা নিয়ে বসে আছে।এক কাপ সামনে আর অন্য কাপ খাচ্ছে। দিপু কিছুটা লজ্জা নিয়ে বসলেন সামনে।
লেখাটা আপনার?
-কি মনে হয় দিপু সাহেব?
না মানে…
-হুম আমার লেখা।
দুইকাপ চা কেন?
-কিছু মানুষ এককাপ চা খেয়ে মনঃতৃপ্তি পায় না। আমিও তাদের একজন।
দুই কাপ একসাথে নিলেও পারতেন তো।আলাদা কেন?
-কারণ এক কাপ আপাতত আপনার।দারোয়ান কিছু বলে নি আপনাকে?
কোন দারোয়ান?
-আপনার বাসার।
আপনি আমার বাসা কিভাবে চিনলেন?
-আমার বাসা ঐ একই রাস্তা দিয়েই যেতে হয়।একদিন আপনাকে দেখেছিলাম সেই বাসায় যেতে তাই ধরেই নিয়েছিলাম সেখানে আপনি থাকেন।
অহ! আমি গতকাল রাতে ফুফুর বাড়ি ছিলাম।
-ফুফুর বাসায় ছাতা নেই বুঝি?সকালে ভিজে ভিজে আসলেন যে…
-খুব ইচ্ছা করছিলো তাই ভিজেই আসলাম।আমার কিছু অদ্ভুত অদ্ভুত ইচ্ছা হয় মাঝে মাঝেই।
-দিপু সাহেব, ভেজা শরীরে পৃথিবীর সকল মানুষের রুপ কিছুটা বদলে যায় মনে হয়।সব কিছু যেন অপূর্ব হয়ে উঠে।