মরীচিকা পর্ব-০৪

0
মরীচিকা

মরীচিকা পর্ব-০৪

রাহি হেটে চলছে এই পিচঢালা উত্তপ্ত পথ ধরে। আজ এত সকালেই এত কড়া রোদ কেন উঠেছে ?মাঝে মাঝে প্রকৃতিও তার নিয়ম ভাঙ্গার চেষ্টা করতে থাকে হয়তো।
পকেটে টাকা থাকলেও অনেক সময় বিপদে পড়তে হয়, আজ রাহিরও সেই অবস্থা। পকেটে ৫০০ টাকার চকচকে নোট কিন্তু কোন রিক্সাওয়ালার কাছে নাকি খুচরা হবে না।
এই গরমে কালো শার্ট পড়াতে রাহির অবস্থা বেশ খারাপ হতে শুরু করেছে। শরীর বেয়ে ঘাম নামতে শুরু করেছে।সকালে শুরু টা ভাল লাগে, সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠে বেঁচে থাকার যুদ্ধে।সবার মধ্যে একটা তাড়া কাজ করে।সুখতারার মোড়ের রহিম চাচার চায়ের দোকান টা আজ বন্ধ।গতকাল রাতে বাংলাদেশ ক্রিকেটে জিতেছে। বাংলাদেশ জিতলে উনি আবার পরের দিন দোকান খোলে না। স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাদেরকে নিয়ে মায়েরা খুব দ্রুততার সাথে হাটছে।কোন কোন মা বলছে,শোন টিফিন যেন সম্পুর্ণ খাওয়া হয়,একা একা খাবি বলে দিলাম।অতি ভালবাসতে গিয়ে ছোট বেলা থেকেই স্বার্থপর হবার একটা ট্রেইনিং দেওয়া হয়,এটা বাবা মা ধরতে পারেন না।
রাহির পাশ দিয়ে শাঁ করে চলে গিয়ে একটু সামনে কালো রংয়ের গাড়ি থামলো।রাহি একটু এগিয়ে যেতেই গাড়ির গ্লাস খুলে ইমা ডাকছে, স্যার!
রাহি গাড়ির কাছে যেতেই ইমা বললো,স্যার!আসসালামুয়ালাইকুম।এদিকে কোথায় যাচ্ছেন?
-অফিসে যাচ্ছি। তুমি কই যাচ্ছো?
স্যার,আমি এমনি ঘুড়তে বেরিয়েছি। সকালের সব কিছুই অনেক সুন্দর হয়। স্যার,আসুন,আপনাকে নামিয়ে দিবো যেখানে যেতে চান।
রাহি ভাবছে, সামাজিকতা রক্ষায় বলবে ‘না থাক’! নাকি উঠে পড়বে।এই গরমে আর হাটা সম্ভব না৷
-আচ্ছা। আমি ত্রিমোহনী বাজারে নেমে যাবো।

গাড়ি চলছে মাঝারি গতিতে।গাড়িতে হাল্কা সাউন্ডে বাজছে..’ভালবেসে সখী নির্ভীতে যতনে আমার নামটি লেখ তোমার মনেরও মন্দিরে’ গানটা মন্দ নয়,শুনলে মন হাল্কা লাগে।
ইমা মৃদু হাসছে। চুল গুলো উড়ছে,চোখে মুখে আছড়ে পড়ছে। হালকা হলুদ রঙের একটা জামা।কানে হালকা হলুদ রংয়ের কানের দুল।রাহি ভাবছে,তিনছর এই মেয়েকে আমি পড়ালাম, এত সুন্দর তো আগে মনে হয়নি!আজ এত সুন্দর লাগছে কেন কে জানে। হতে পারে চোখের ভ্রম।মাঝে মাঝে চোখেরও নিয়মের বাইরে যেতে ইচ্ছা করে।
স্যার,আপনি তো আমাকে ফোন দিলেন না এখন অবদি!
-আসলে একটু ব্যস্ত ছিলাম।
স্যার,এখন কি সময় হবে একটু?
-হুম, কিছুটা।
স্যার, আমার নম্বরে তাইলে একটু ফোন দিবেন।
রাহি ফোন টা পকেট থেকে বের করে নম্বর তুলে ফোন দিলো ইমার ফোনে।
স্যার,চলেন আজ আমরা একটু শহরটা ঘুড়ে আসি।নদীর পাড়ে একটু বসি,দুইজন আইসক্রিম খেতে খেতে কিছু গত চারবছরের কিছু গল্পও করে ফেলা যাবে।
-না। আজ না ইমা,আজ আমার জরুরী কাজ আছে। অন্য কোন দিন গল্প করা যাবে।
স্যার,আপনিও মিথ্যা বলেন নাকি ভুলে এমন হয়েছে?
-মিথ্যা কথা আমরা মানুষ হিসাবে কম বেশি সবাই বলি।চিরসত্যবাদী এই পৃথিবীতে একজনই ছিলেন আর তিনিই শেষ।এবার বলো তুমি কোনটার কথা বলছো?
এই যে আজ তো শুক্রবার,অফিস তো খোলা থাকার কথা না।
-অহ,তাইতো!আমি যাচ্ছি আমার এক অফিস সহযোগীর কাছে।গত কয়েকদিন যাবৎ তার একটা চিঠি আমার কাছে,এটা পৌছে দিতে।
এই সময়েও চিঠি আসে স্যার!
-আসে হয়তো প্রতিদিন কারো না কারো নামে কিন্তু আমরা জানি না,খোজ রাখি না।কারণ চিঠি ছাড়াও এখন অনেক মাধ্যম আমাদের আছে।
ইমা ভীত গলায় বললো,স্যার উনাকে না হয় ফোন করে বলে দেন বিকেলে যাবেন!
-উনি ফোন ব্যাবহার করেন ঠিকই কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই হয় তা বন্ধ থাকে নতুবা রিসিভ করেন না!!
স্যার‍,আমি যদি আপনাকে মাঝে মাঝে গভীর রাতে ফোন দি আপনি কি বিরক্ত হবেন?
-উহু! বিরক্ত হবো না কিন্তু মহাবিরক্ত অনুভব করবো।
কেন স্যার?
-গভীর রাতে কথা বলা উচিত বিশেষ কিছু সম্পর্ক যুক্ত মানুষদের।
কেমন বিশেষ স্যার?
-প্রেমিক-প্রেমিকা,স্বামী স্ত্রী!
প্রেমিক কিংবা প্রেমিকা হবার আগেও তো কথা বলেই হবার চেষ্টা করে।
-ইমা,সামনেই ত্রিমোহনী বাজার।আমাকে নেমে যেতে হবে।
স্যার,না নামলে হয় না এখন?
-মাঝ বয়সী মেয়ের সাথে বেশি সময় কাটাতে নেই এতে বিপদ বাড়ে…

দিপু চিঠি হাতে নিয়ে বসে আছে। হাত কাঁপছে কেন যেন।।মন একবার ভীষণ খারাপ হচ্ছে আবার মন ভীষণ ভাল হচ্ছে।হাতের কাঁপার কারণ হচ্ছে চিঠির খামেএ নিচে ছোট্ট করে লেখা ‘মৃদুলা’।
খাম খোলার পর দিপু দেখলো আর একটি খাম!এই খামটি ছোট করে বানানো এবং এটা বাশপাতার কাগজে। সেখানে বড় করে লেখা ‘মাস্টার মশাই’।খামটি খোলার পর আর একটি খাম!সেখানে লেখা ‘ভয় লাগছে?’ এর পর চার ভাজে ভাজ করা একটা চিঠি….

মাস্টার মশাই,
আপনার কি হাত কাঁপছে নাকি পা?নাকি ভূড়ি কাঁপছে।দেখলাম আপনার একটু ভুড়ি হয়েছে।কেমন আছেন?
কি ভেবেছিলেন,আমি ভুলে গেছি?উহু! একদম না।আপনার বেশ পরিবর্তন হয়েছে দেখলাম।দাড়ি আগের চেয়ে বেশি ঘন,চুল কমে গেছে মাথার।আচ্ছা মাথার চুল কমে কি দাড়িতে যোগ হয়েছে নাকি?হা-হা-হি-হি।
আপনি রোজ এক রংয়ের শার্ট পড়ে অফিসে যান কেন?আপনার কি শার্ট নেই?আপনাকে আমি অনেক খুজেছি।আপনি যে মেসে থাকতেন আমি সেখানে খোজ নিয়ে আপনার ঠিকানা পাই নি।আপনার যে নম্বর আমার কাছে ছিল সেটাও চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। তবুও শতবার ফোন করেই গেছি, যদি একটি বার হলেও সফল হই কিন্তু আমার ব্যর্থতার অধ্যায় ক্রমেই বেড়েছে।অবশেষে আপনাকে পেলাম এক লাইব্রেরির সামনে..।তারপর পিছু নিয়ে আপনার অফিস অবদি।আপনার ফোন নম্বর আমার কাছে আছে এখন, কিন্তু ফোন করি নি।আপনার ফোন নম্বর পেয়েই আমার দুই দিন ঠিক মত ঘুম হয় নাই,কথা বললে কি হবে জানি না।তবে কোন একদিন ফোন করবো এবং তা খুব দ্রুতই। আচ্ছা, আপনার কি আর ইচ্ছে করে একসাথে বসে বাদাম খাওয়াটা?আপনি খোসা ছাড়িয়ে দিবেন আর আমি খাবো!আমার মাঝেই মাঝেই ইচ্ছা করে নীল আর বেগুনী রংয়ের ঐ শাড়িটা,হাতে নীল চুড়ি পরে হটাৎ করে আপনার সামনে গিয়ে যদি আপনাকে চমকে দিতে পারতাম!আপনি মৃদু স্বরে বলতেন কি অপূর্ব! কিন্তু সব ইচ্ছা কি ধরা দেয় বলুন? এক কাপ চা ভাগ করে খাবার মত কেউ কি আপনার জীবনে এসেছে?? নাকি এখনো দেবদাস?
মাস্টার মশাই, মাঝে মাঝেই স্বপ্নে দেখি আপনি এক্সিডেন্ট করেছেন!আমি চিৎকার করে উঠি ঘুমের মধ্যে। আমার বাচ্চাটাও চিৎকারে কান্না করে উঠে মাঝে মাঝে। জানেন, আমার একটা ফুটফুটে বাচ্চা আছে। নাম রেখেছি রাহাত।আপনিই তো বলেছিলেন, আমার বাচ্চার নাম রাখবেন রাহাত..রাহাত নামটা আছে, কিন্তু আপনি…!
মাস্টার মশাই,আমার হাত কাঁপছে। আমি লিখতে পারছি না।জানি না চিঠি টা আপনার হাতে পৌঁছে কিনা!!মাঝে মাঝে চিঠি দিলে কি আপনি বিরক্ত বোধ করবেন? আমার রুমে একটা সিন্দুক আছে জানেন,সেই সিন্ধুকে শত শত চিঠি জমে আছে ঠিকানা ছিল না বলে দিতে পারি নাই।কিছু কিছু মানুষকে সারা জীবন চিঠি লিখে যেতে ইচ্ছা করে।
আপনার সাথে আমার যেন কোন পুর্ণিমার রাতের সন্ধ্যায় দেখা হয়। আমি প্রতি পুর্ণিমার রাতের সন্ধ্যায় কারো জন্য অপেক্ষার প্রহর গুণবো।
কত প্রশ্ন করে গেলাম কিন্তু উত্তর লেখার জায়গা টা দিলাম না তাই না?আচ্ছা একটা নম্বর দি.. জিরো অয়ান ফাইব টু ওয়ান ফোর সেভেন ফোর…… বাকি টুকু আপনি বের করবেন।আপনি তো মাস্টার মশাই।আমি অপেক্ষায় থাকবো

মৃদুলা।।

দিপু,শক্ত হয়ে বসে আছে।বমি বমি ভাব হচ্ছে।প্রচন্ড আনন্দে অথবা কষ্টে দিপুর বমি পায়।দিপুর মনে হচ্ছে নীল-হালকা বেগুনী মিশ্রিত রংয়ের শাড়ি, হাতে নীল চুড়ি, কপালে একটা কালো টিপ দিয়ে কেউ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে,আবার মনে হচ্ছে মৃদুলা বিছানায় বসে পা দুলাচ্ছে।কানে কানে বলছে,মাস্টার মশাই! আমি আপনার ছাত্রী হবো।মাখে মাঝে জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন কি করা উচিত তা বুঝে উঠতে পারা যায় না। দিপুর বর্তমান অবস্থাও ঠিক তেমন।
দিপু,মোবাইলটা অন করে তাকিয়ে আছে মোবাইলের দিকে..

Leave a Reply