করোনা দিনলিপি: বাসায় বন্দী থাকার ৩৭তম দিন।

0

করোনা দিনলিপি: বাসায় বন্দী থাকার ৩৭তম দিন।

জনসংখ্যা প্রতি আক্রান্তের হারের দিক দিয়ে সুইজারল্যান্ড এখন ইতালিকে ছাড়িয়ে সবার উপর। মোট আক্রান্তের সংখ্যায় আমেরিকা সবার উপরে উঠে এসেছে। পৃথিবীর অবস্থা প্রতিদিন আরো খারাপ হচ্ছে। অনেকেই এর শেষ খুঁজছেন। কিন্তু আমার ভয় হয় আমরা এখনো এর শুরুর শেষটাও দেখিনি, আর এর শেষের শুরু খোজা বাদই দিলাম।




corona virus

আমাদের দেশে মূলত টেস্টিং এবং চিকিৎসাব্যবস্থায় বিশাল ঘাটতির সমাধান ছাড়া বাকি যা যা প্রয়োজন ছিল, বিশেষ করে দেশের নানান শাখাপ্রশাখা লক ডাউনের বিষয়ে, তার প্রায় অনেকটাই এখন হয়েছে বা হচ্ছে। কিন্তু শুধু আর কয়েকটা দিন আগে যদি এই একই কাজগুলোই করা যেত তাহলে তার উপকার হতে পারতো আরো বহুগুন বেশি।

এই ভাইরাসের সবচেয়ে কঠিন দিক হচ্ছে এর ব্যাপারে আপনি আজকে যে পরিস্থিতি দেখছেন, সেটা নির্ধারণ হয়ে গিয়েছিল আপনার ২-৩ সপ্তাহ আগের কার্যকলাপে। আপনি ইতিমধ্যেই আক্রান্ত হয়ে থাকলেও আপনার মধ্যে ২-৩ সপ্তাহ পর্যন্ত কোন অসুস্থতা নাও দেখা যেতে পারে। কিন্তু এই সময়ে আপনি ঠিকই চারিদিকে সেটা ছড়িয়ে বেড়াবেন।

অর্থাৎ আমরা মানুষেরা সবসময় এই ভাইরাসের চেয়ে ২-৩ সপ্তাহ পিছিয়ে থাকবো। তাই আমাদের চিন্তা করার ক্ষেত্রে ২-৩ সপ্তাহ এগিয়ে থাকতে হবে। পরীক্ষার জন্যে পড়াশোনা আমরা ঠিকই এখন শেষ রাতে এসে করছি, কিন্তু দেখার বিষয় হচ্ছে পরীক্ষা আগামীকাল নাকি গতকাল ইতিমধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। এখন শুধুই তার জন্যে অপেক্ষা।




তবে এটা পরিষ্কার যে এই পরীক্ষায় কাগজের ফলাফলে আমাদের ফেল করার কোন উপায় নেই। অর্থাৎ করোনাতে আমাদের দেশে খুব বেশি মানুষ আক্রান্ত হবার বা মারা যাবার সুযোগ নেই। এখন শুধু দেখার বিষয় হটাৎ করেই জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হওয়া বা মারা যাওয়া বেড়ে যায় কিনা। টেস্ট যেহেতু করা হবে না তাই এগুলো সাধারন অসুখ হিসেবে বিবেচ্য হয়ে করোনা পরিসংখ্যানে আসবে না।

সুখবর হল অনেকটা এভাবেই ভোটের পরিসংখ্যান বদলে দিয়ে, দেশের মানুষকে বোকা বানিয়ে নির্বাচনের ফলাফল ঘুরিয়ে দেয়ায় আমরা বেশ পারদর্শী। দোয়া করি করোনা পরিসংখ্যান বদলে দিয়ে আমরা যেন একইভাবে এই ভাইরাসকেও বোকা বানিয়ে, পুরো বিশ্বের তুলনায় আমাদের দেশে এই করোনা মহামারীর ফলাফল ঘুরিয়ে দিতে পারি।

তবে শুধুই সরকারের সেই পরিসংখ্যান বদলে দেয়ার পারদর্শিতায় নির্ভর করলে চলবে না। করোনার আরেক কঠিন দিক হল এর বিরুদ্ধে আমাদের জয় পরাজয় নির্ভর করছে আমাদের চারপাশের প্রতিটি মানুষের উপর। আপনার বাসার একজনও যদি নিয়ম ভেঙ্গে বাইরে ঘুরতে বের হয়ে পড়ে তাহলে আপনার শত চেষ্টাও কোন কাজে আসবে না।




অর্থাৎ এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে মানুষ হিসেবে আমরা একে অপরের সচেতনতা, বিবেচনা, সহযোগিতার উপরে প্রচণ্ড নির্ভরশীল। আপনি নিজেকে সুস্থ রাখা মানে আপনি কিছু না করেই আমাদের সীমিত হাসপাতাল ব্যাবস্থায় আপনার জন্যে বরাদ্দ সুবিধাটুকু আরেকজন অসুস্থ মানুষকে দান করেছেন।

আর আপনি অসুস্থ হয়ে সেখানে জায়গা নেয়া মানে আপনি আরেজনের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছেন। বিশেষ করে যাদের এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলায় আপনার মত পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা নেই, আপনার নিজেকে সুস্থ রাখায় একটু বিচক্ষণতা হয়তো শেষে তাদের জীবন মৃত্যুর পার্থক্য হয়ে দাড়াতে পারে।

আমি জানি না শেষ কবে পৃথিবীর মানুষকে একে অপরের উপর এতটা নির্ভরশীল হতে হয়েছিল। শুধু যদি মানুষকে এত কষ্ট না পেতে হতো, বা মারা না যেতে হতো, তাহলে বলতে দ্বিধা ছিল না যে এই পুরো পরিস্থিতি, মানবজাতিকে প্রায় সব মানবিক গুণাবলীর দিক থেকেই আরও উন্নত করে তুলছে।

কিন্তু পৃথিবীর আজকের এই করুন অবস্থায় সেই চিন্তা বা সান্ত্বনার মূল্য একদমই তুচ্ছ। তাই সেই বিষয় ভবিষ্যতের জন্যে রেখে দিয়ে আমাদের বর্তমানে মনোযোগ দেয়াই শ্রেয়।




– Zaheed Sabur