মরীচিকা পর্ব- ০৫

0
মরীচিকা

দিপুর ঘুম ভেঙে গেল একটা মেয়ের চিৎকার চেচামেচিতে!দিপু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো, সকাল ৭ টা বেজে ২৫ মিনিট। জলিলের গলাও শোনা যাচ্ছে,খুব সম্ভবত জলিল মেয়েটাকে থামানোর চেষ্টা করছে।মেয়ের গলাটা পরিচিত হলেও ঠিক মনে করতে পারছে না দিপু। মাঝে মাঝে পরিচিত অনেক কিছুও অপরিচিত মনে হয়।
দিপু জানালার পর্দা সরিয়ে দেখতে পেল অতন্দ্রিতা।গাছের নতুন পাতার যে রঙ ঠিক সেই রংয়ের একটা শাড়ি পড়েছে অতন্দ্রিতা।দুই হাতে দুই ব্যাগ, চোখে
কাজলের পরিমাণ যথেষ্ট বেশি হবার কারণে ভীষণ বাজে দেখাচ্ছে তাকে।চোখের কাজল অনেকটা লবণের মত।লবণ কমবেশি হলে যেমন খাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে তেমনি কাজল পরিমাণের চেয়ে কম-বেশি হলে তাকানো যায় না।অতন্দ্রিতা বার বার বলছে,দিপু সাহেবকে ডেকে দিন নতুবা আমাকে যেতে দিন।দিপু সাহেব আমাকে চিনেন, কোন সমস্যা নেই।
জলিল বার বার ভদ্র ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছে।
জলিল বলছে, ম্যাডাম। স্যার ৮ টার আগে ঘুম থেকে উঠেন না,আর স্যারের অনুমতি ছাড়া আমি আপনাকে ভেতরে যেতে দিতে পারছি না।আপনি একটু বসুন,৮ টা বাজলেই আমি স্যারকে ডেকে দিবো।
জলিলের দ্বায়িত্ববোধ দেখে দিপুর বেশ ভাল লাগছে আবার অন্যদিকে দিপু ভাবছে এত সকালে অতন্দ্রিতা কেন??
দিপু জানালা খুলে জলিলকে ডেকে বললো,জলিল উনাকে আসতে দাও।আর আপনি ২য় তলায় চলে আসুন।

এই প্রথম কোন মেয়ে তার বাড়িতে এসেছে।একদিকে ভীষণ অস্বস্তি লাগছে কারণ এর আগে কোন মেয়ে এভাবে আসে নি,জলিলই বা কি ভাবছে!আবার অন্যদিকে ভালও লাগছে।
অতন্দ্রিতাও বেশ কিছুটা লজ্জা পাচ্ছে।
দিপু সাহেব,ফ্রেশ হয়ে আসুন দ্রুত।কথা আছে..
অতন্দ্রিতা দেখছে দিপুর ঘর বেশ গোছালো।
একজন অবিবাহিত মানষের ঘর এত গোছানো থাকবে কেন? তিনটা ঘর।একটা দিপুর বেড রুম,সেই
ঘরের কোণে একটা একটা জায়নামাজ বিছানো,একটা পানির ফিল্টার, একটা ওয়ারড্রোব,একটা টেবিল।অন্যরুমের দেওয়াল জুড়ে দেওয়াল চিত্র আঁকা।একপাশের দেওয়ালে বড় করে বাধাই করা হুমায়ুন আহমেদের একটা ছবি,আঁকানো ছবি।একটা বড় বুক সেলফ, বেশির ভাগ বই কাজী নজরুল ইসলামের ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।মাঝে মাঝে কিছু হুমায়ুন আহমেদ, শরৎচন্দ্র,জহির রাহহান,আহমেদ ছফার বই দেখা যাচ্ছে।
রুমের সাথেই মাঝারি আকারের একটা বারান্দা।বারান্দায় একটা টেবিল।টেবিলের উপরে রাখা এক প্যাকেট সিগারেট।
আর অন্যটি রান্না ঘর।

দিপু,অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে অতন্দ্রিতার দিকে।অনেক বছর পর কেউ তার জন্মদিনে পায়েস রান্না করে এনেছে।শুধু পায়েস না।সাথে আছে পোলাও,দিপুর প্রিয় দেশী মুরগী ভুনা এবং একটা ছোট্ট কেক। দিপুর,দেখে মনে হচ্ছে একটা বাধাই করা ছবিও এনেছে সাথে কিন্তু ছবিটা কাগজ দিয়ে মোড়ানো।

আপনি কিভাবে জানলেন আজ আমার জন্মদিন?
-দিপু সাহেব,এর উত্তর আমি আপনাকে দিতে পারছি না এখন।
আপনি এত সকালে এত রান্না করে এনেছেন কেন!
-দিপু সাহেব, সব কথার উত্তর হয় কি?আপনাকে আমি উত্তর দিতে পারছি না।
আপনাকে খুব বাজে দেখাছে, চোখের কাজলের জন্য।
-সে আমি জানি।ইচ্ছা করেই এমন করেছি।কেন করেছি বলতে ইচ্ছুক নয়।
আপনি বরং আর একটু খাবার তুলে নিন তাতেই আমি খুশি হবো।
দিপু এই দিয়ে দুই প্লেট শেষ করেছে।সকালে এত খাবার অভ্যাস দিপুর নেই কিন্তু আজ আরও খেতে ইচ্ছা করছে।আপনি একটা ফাকা কাগজ বাধাই করে এনেছেন,এর কারণ কি?
-দিপু সাহেব,জীবনে আপনাকে কেউ সাদা কাগজ বাধাই করে দিবে না।কিন্তু আমি দিলাম.. এর কারণ আজ বলতে পারছি না।
দিপু সাহেব,আপনি কি বিড়ম্বিত?
হ্যা, কিছুটা।
-দিপু সাহেব, আমি যদি সিনেমা হলে গিয়ে আপনার হাত ধরে সিনেমা দেখি, অসুবিধা আছে?
দিপু,অতন্দ্রিতার কথা শুনে চুপ করে আছে।
জোড়ে হেসে উঠলো অতন্দ্রিতা। কি দিপু সাহেব ভয় পেলন…?
দিপু হতভম্ব হয়ে বললো,না!মানে আমি ভাবছিলাম..!
-আমি মজা করে বললাম দিপু সাহেব,ভয় পাবেন না।
দিপু সাহেব,একটা প্রশ্ন করি?
হুম।
-আপনার রুম ভর্তি কাজী নজরুলের বই কিন্তু রুমে বড় করে হুমায়ুন আহমেদের ছবি বাধাই করা কেন?
আমিও এই প্রশ্নের উত্তর এখন দিতে পারছি না! বলে হেসে উঠলো দিপু..
কি সুন্দর হাসি দিপুর!অতন্দ্রিতা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দিপুর হাসি দেখছে….

আজকাল এই শহরে আর পায়ে চালিত রিক্সা দেখা যায় না।সব রিক্সায় মেশিন লাগানো।দ্রুত ছুটে চলে।আগে রিক্সায় যাত্রা করলে যে রাহির মনে যে স্বস্তি বিরাজ করতো এখন তা করে না।মনে হয় দ্রুত সব কিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে।তবে রাহির আজ মনে হচ্ছে দ্রুত যাত্রা শেষ হোক। পাশে বসে আছে এক অভদ্রলোক।নাম জব্বার,পেশায় পাড়ার পরিচিত মাস্তান!সকালে রিক্সায় অফিসে আসার পথে রাহির রিক্সা থামিয়ে উঠেছে। বলেছিলো সামনে নেমে যাবে কিন্তু এখনো নেমে যায় নি।
রাহি তুই আমার উপর রেগে আছিস?
-না!জব্বার ভাই কি যে বলেন।
তোর কি মনে হয় মাস্তানরা মানুষের বিরক্তি বুঝতে পারে না??মাস্তানের প্রথম কাজ হচ্ছে মানুষকে বিরক্ত করা।আর সেটাই যদি না বুঝতে পারি তাইলে আমি কিসের মাস্তান।
-রাহি কিছুটা ভীত গলায় বললো, জব্বার ভাই মাঝে মাঝে মাঝে দক্ষ চিকিৎসকরাও ভুল করে ফেলেন।
জব্বার জোরালো স্বরে হাসতে হাসতে বললো,তা অবশ্য ঠিক।তুই তো বেশ বুদ্ধিমান দেখছি।
সকাল সকাল হাতে ফুল নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?
-আমার এক সহকর্মীর জন্মদিন আজ ভাই, তাকে শুভেচ্ছা জানাতে।
জন্মদিন তো মানুষের একদিনই হয় রাহি।তোরা শিক্ষিত সমাজ মাঝে মাঝেই বুদ্ধিহীনের মত কাজ করিস।
রাহি চুপ করে রইলো।রাহি নেমে গেল চারমাথার মোড়ে।জব্বার রাহিকে ভাড়া দিতে দিলো না।

জলিল কেমন আছো??
-জে স্যার ভাল।
দিপু ভাই আছেন নাকি চলে গেছেন অফিসে?
-হ্যা অনেক্ষণ আগেই বের হয়ে গেছেন।
রাহি কথা না বাড়িয়ে অফিসে গিয়ে দেখে দিপু তার ডেক্সে নেই!পাশের ডেক্সের অতন্দ্রিতাও নেই!জানা গেল আজ নাকি দিপু অফিসে আসবে না।
সকাল বেলা মন খারাপ হলে রাহির সারা দিনই খারাপ যায়।
অস্থির লাগছে কেন যেন।রাহি মতিন কে ডেকে বললো,চিনি ছাড়া এক কাপ চা দিতে।
অস্থিরতা কাটাতে চিনি ছাড়া চা ভাল কাজে দেয় বলে রাহির ধারণা।দিপুকে তিনবার চেষ্টা করেও ফোনে রাহি পেল না।
বিকেল ৩.৪০ টা, অফিস ছুটি হতে কিছু সময় বাকি মাত্র।রাহি কাজে মন দিতে পারছে না, সিনিয়র অফিসারকে বলে বের হয়ে গেলো রাহি।
অফিসের সামনে একটা সিলভার রংয়ের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।গাড়ির জানালা খুলে ইমা বসে আছে।
রাহিকে দেখেই ইমা বললো,স্যার!!আসসালামুআলাইকুম। স্যার এখানে কোন কাজে?
ইমা এটা আমার অফিস।আমি এখানেই কাজ করি।
ইমা,তুমি অফিস কিভাবে চিনলে? তোমাদের গাড়ি কয়টা! এর আগে যে কালো রংয়ের গাড়ি ছিল?
স্যার,এটা আমাদের গাড়ি নয়।এটা আমার বড় খালার মেয়ের গাড়ি। আর আপনার কাছে আমরা আসি নি, আপনার সাথে কাকতালীয় ভাবে দেখা হয়ে গেল মাত্র। উঠে আসুন…
আসুন,কথা আছে।
গাড়িতে উঠে বসতেই রাহি খেয়াল করলো ড্রাইভার একজন মেয়ে।
রাহি ইমাকে চোখের ইশারায় জিজ্ঞাসা করতেই ইমা বললো,ইনি আমার বড় খালার মেয়ে।নাম মৃদুলা…

Leave a Reply